সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

যার হাত থেকেই ছড়ায় টাইফয়েডের জীবাণু অতঃপর মহামারি!

news-image

রান্না করতে তিনি খুব পছন্দ করতেন। আর তাইতো রাঁধুনি হিসেবে খ্যাতি পান মেরি। তবে কে জানতো? তার হাতে তৈরি মজাদার খাবারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে টাইফয়েডের জীবাণু। বিংশ শতাব্দীতে নিউইয়র্কে টাইফয়েড মহামারি আকার ধারণ করেছিল। জানেন কি? এই টাইফয়েড ছড়িয়েছিল মেরি নামক ওই নারী।

মারাত্মক ছোঁয়াচে হিসেবে তখন টাইফয়েডের প্রাদুর্ভাব ঘটে। তবে আশ্চর্যজনক বিষয়টি হলো নিজের শরীরে মেরি টাইফয়েডের জীবাণু পুষলেও তিনি পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন। অথচ তার তৈরি আইসক্রিমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল টাইফয়েড রোগটি। বর্তমান যুগে এসে অনেকেই এই কাহিনী বিশ্বাস করবেন না নিশ্চয়ই! বিষয়টি সত্যিই, আর তাইতো ইতিহাস তাকে আখ্যায়িত করেছে ‘টাইফয়েড মেরি’ নামে।

বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। এরই মধ্যে ভাইরাসটিতে প্রাণ হারিয়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। আক্রান্ত আছে দুই লাখের বেশি মানুষ। এটি চীনের উহান শহর থেকে সাপ এবং বাদুড়েরে মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু করোনা নয় যুগে যুগে পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে অজানা মহামারি রোগ আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে টাইফয়েড অন্যতম। যা ছড়িয়েছিলেন মেরি নামক এক নারী। আজ তবে জানুন গুপ্ত ঘাতক এই নারীর আদ্যোপান্ত-

টাইফয়েড মেরির আসল নাম মেরি মেলোন। ১৮৬৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর উত্তর আয়ারল্যান্ডের কুকসটাউনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দরিদ্র গ্রামে জন্ম নেয়া মেরি মেলোন শৈশব দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। দুই বেলা ঠিক মতো খাবার জোগাড়ের জন্য খুব ছোট থেকেই কাজে বেরিয়ে পড়েন তিনি। তবে ভাগ্য তার সহায় হয়নি। একসময় তিনি বুঝতে পারলেন, এখানে থাকলে তাকে না খেয়ে মরতে হবে। তাই সুযোগ বুঝে ১৮৮৩ সালে সপরিবারে পাড়ি জমান স্বপ্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে।

টাইফয়েড মেরি

টাইফয়েড মেরি

সেসময় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বুকে জেগে ওঠা নতুন পরাশক্তি। হাজারো অভিবাসীর আশা-ভরসার প্রতীক দেশটি। এখানে এসে যেন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন মেরি। রান্না এবং ঘরের বিভিন্ন কাজ শিখে ফেলেন মেরি। সেসময় অভিবাসী নারীদের গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করার অনুমতি ছিল। মেরিও গৃহপরিচারিকার কাজ নেন। তবে খারাপ আচরণের জন্য কয়েক বছরেই তিনি চাকরিচ্যুত হতেন। আবার নতুন জায়গায় কাজ নিতে হলো তাকে। রান্নার প্রতি মেরির আগ্রহ ছিল প্রবল। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল মেরি মেলোনের।

মেরির জীবনের কালো অধ্যায়

১৯০০ সালে যখন মেরি নিউইয়র্কের এক ধনী পরিবারে রান্নার কাজ শুরু করেন। তখন সেই পরিবারের ১১ জনের মধ্যে ৬ জনই টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়। তারা ছিলেন শহরের ধনকুবের চার্লস ওয়ারেনের ওয়েস্টার বের বাড়ির ভাড়াটে। ওয়ারেন এই ঘটনায় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েন। তবে বাড়ির সদস্যদের অসুস্থতার বাইরেও তার চিন্তার অন্য কারণ ছিল। এই ঘটনার পর আর কখনো উক্ত বাড়িটি কেউ ভাড়া নিতে রাজি হবে কিনা তা নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলেন ওয়ারেন।

এরপরই তিনি জর্জ সপার নামক এক শৌখিন গবেষককে ডেকে পাঠান। জর্জ সপার পেশায় একজন প্রকৌশলী হলেও তিনি টাইফয়েড মহামারি নিয়ে কাজ করছিলেন। সপার প্রথমেই টাইফয়েডের উৎস খুঁজতে বাড়ির বিভিন্ন জায়গার পানির উৎসের নমুনা পরীক্ষা করেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে কোথাও তিনি টাইফয়েডের জীবাণু খুঁজে পাননি। অসহায় সপার একটা সময় প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। ঠিক তখনই তার পরিচয় হয় বাড়ির গৃহপরিচারিকা মেরির সঙ্গে।

সপার লক্ষ্য করলেন বাড়ির অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত হলেও মেরি পুরোপুরি সুস্থ আছেন। মেরির এ সুস্থতাই সপারের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। তিনি মেরির ইতিহাস ঘাঁটতে শুরু করলেন। সপার এবং তার দলের সদস্যরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন মেরি মেলোন গত সাত বছরে প্রায় আট বাড়িতে কর্মরত ছিলেন। যার সাত বাড়ির সদস্যরাই টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছিল। তবে মেরি কখনো অসুস্থ হননি।

তখনকার ম্যাগাজিনেও উঠে আসে তার নাম

তখনকার ম্যাগাজিনেও উঠে আসে তার নাম

সপার এবং তার দলের সদস্যরা আরো কয়েকটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে মেরিই এই মহামারির মূল হোতা। তবে মেরি এই ব্যাপারটি মানতে নারাজ। সপার মেরির বিভিন্ন পরীক্ষা করে এ ব্যাপারে  নিশ্চিত হন। তিনি মেরির স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফলাফল জার্নাল অব আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃপক্ষে প্রকাশ করার পরে নিউইয়র্ক কর্তৃপক্ষ মেরিকে আটকের নির্দেশ দেন। তবে মেরির অপারগতা এবং একগুঁয়েমির কারণে অবস্থা বেগতিক হয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত পাঁচজন পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় কয়েক দফা জোর করে মেরিকে বন্দি করা হয়। একজন কর্মকর্তা এটিকে অবরুদ্ধ সিংহের খাঁচায় থাকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তবে মেরি মেলোন ঠিক কখন এবং কীভাবে এ ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয় সে সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায়নি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, মেরি মেলোন টাইফয়েড জীবাণু বহন করলেও তার দেহে টাইফয়েডের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। ফলে তিনি টাইফয়েডের একজন সক্রিয় বাহক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে থাকেন। এজন্য গবেষকরা মেরির দেহের অসাধারণ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেই দায়ী করেন।

মেরি মূলত খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে মানুষের মাঝে টাইফয়েড জীবাণু ছড়াতে থাকেন। মেরি নিজেও জানতেন না তার এই বৈশিষ্ট্যের কথা। সবার অগোচরে প্রায় ৫১ জন মানুষের দেহে টাইফয়েড ছড়িয়ে দেন মেরি! সেই ৫১ জনের দ্বারা আরো হাজার হাজার মানুষ টাইফয়েড আক্রান্ত হয়ে পড়েন। এদের মধ্যে মারা যান তিনজন। নিউইয়র্কে টাইফয়েড প্রায় মহামারি আকারে দেখা দেয়।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার মতে, ১৯০০ সাল থেকে শুরু করে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২ জন লোক টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হন। যাদের বাসায় মেরি স্বল্প সময়ের জন্য হলেও গৃহপরিচারিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সাধারণ গৃহপরিচারিকা মেরি মেলোন ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন গুপ্তঘাতক টাইফয়েড মেরি! ততদিনে নিউইয়র্কের কাক পক্ষী পর্যন্ত মেরির ব্যাপারে জেনে গেছে। নিউইয়র্কের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে নানা রটনায়। সবার আলোচনায় শুধু টাইফয়েড মেরি।

মেরিকে আটক করা হয়েছিল

মেরিকে আটক করা হয়েছিল

আটক করা হয় তাকে

টাইফয়েড মেরিকে আটক করে নর্থ ব্রাদার নামক একটি দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। মেরি এই অমানবিক সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন। সেখানে তার একমাত্র সঙ্গী ছিল একটি কুকুর। বন্দি অবস্থায় সেখান থেকেই তিনি তার আইনজীবীর মাধ্যমে বিভিন্ন আইনী কার্যক্রম অব্যাহত রাখতেন। নিউইয়র্কের একটি বেসরকারি গবেষণার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে মেরির সঙ্গে টাইফয়েডের সরাসরি সম্পৃক্ততা ভুল প্রমাণিত হয়।

এই প্রতিবেদনকে পুঁজি করে মেরি আপিল করেন। তবে নিউইয়র্কের স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই প্রতিবেদন বাতিল করে দেয়। আপিলের পরেও তাকে মুক্তি দেয়া হয়নি। ১৯১১ সালে নতুন কমিশনার নিয়োগ লাভ করার পরে এ ব্যাপারটি নতুন করে উত্থাপন করা হয়। তিনি মেরির মানবিক দিক বিবেচনা করে একটি শর্তে মুক্তি দেয়ার পক্ষে ভোট দেন। মেরি আর কখনোই রান্নাঘরে কাজ করতে পারবেন না। শর্ত মেনে পুনরায় নিউইয়র্কের মাটিতে পা রাখেন মেরি।

পুনরায় শখের কাজে ফেরা অতঃপর নির্বাসিত

এরপর মেরি বিভিন্ন লন্ড্রিতে কাজ শুরু করেন। তবে এ কাজে একদমই মন মতো ছিল না তার। তিনি রান্না করতে ভালোবাসতেন খুব। আর লন্ড্রির কাজে বেতনও কম ছিল। এরপর তিনি তার নাম পরিবর্তন করে মেরি ব্রাউন রাখেন। পরবর্তীতে ম্যানহ্যাটনের একটি হাসপাতালে রান্নার কাজ নেন তিনি। আর এরপরের অবস্থা হয়েছিল আরো ভয়াবহ। ১৯১৫ সালে হাসপাতালে প্রায় ২৫ জন কর্মী টাইফয়েডে আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে ২ জন মারা যান। নতুন করে নিউইয়র্কে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে টাইফয়েড। নতুন করে টাইফয়েডে আক্রান্ত হতে থাকে মানুষ। ঘুম হারাম হবার উপক্রম গবেষকদের।

গবেষকদল বিভিন্ন সূক্ষ্ম পরীক্ষার পর নিশ্চিত হলেন, এই রোগের জন্য দায়ী হতে পারে হাসপাতালের বাবুর্চি। তারা খুঁজতে থাকেন হাসপাতালের বাবুর্চিকে। রেকর্ড বই ঘেঁটে পাওয়া গেল বাবুর্চির নাম। নাম শুনেই খটকা লাগলো স্বাস্থ্য অধিদফতরের। বাবুর্চির নাম মেরি ব্রাউন। তারা মেরি ব্রাউনের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন। মেরিকে দেখার পর কমিশনার যেন আকাশ থেকে পড়েন। কারণ মেরি ব্রাউনই সেই টাইফয়েড মেরি!

অনেকেই মেরির মাধ্যমে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছিলেন

অনেকেই মেরির মাধ্যমে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছিলেন

তিনি পুনরায় মেরিকে আটকের নির্দেশ দেন। এরপর আবার তাকে নর্থ ব্রাদার দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানেই বন্দি আর নির্বাসিত জীবন পার করেছেন মেরি। একসময় সবাই যেন ভুলেই গেল মেরির কথা। নির্বাসনের প্রথম ১০ বছর মেরির কেটেছে মুক্তির আশায়। নির্বাসিত দ্বীপে তার একমাত্র সঙ্গী ছিল একটি কুকুর। এরপর তিনি নির্বাসনকেই সঙ্গী করে নিয়েছিলেন।

জর্জ সপার জীবনের শেষদিকে অবশ্য অকপটে স্বীকার করেছিলেন যে, আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাই মেরিকে খলনায়ক হিসেবে আবির্ভূত করেছে। তবে ততদিনে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। ১৯৩৮ সালের ১১ নভেম্বর ২৬ বছর নির্বাসিত থেকে মৃত্যুবরণ করেন মেরি মেলোন। মাত্র নয়জন বন্ধুর সমাবেশে তার শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়েছিল। এ মৃত্যুই যেন মেরির মুক্তি।

টাইফয়েড মেরিকে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নানা প্রশ্ন উঁকি দিয়েছে গবেষকদের মনে। একসময় তাদের মনে হয়েছিল মেরি মুক্তি পাওয়ার পর ইচ্ছা করলেই স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারতেন। তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যেন খাবার রান্না করার সময় এবং পরিবেশনকালে ভালো করে হাত ধুয়ে নেয়। তবে অনেকেরই ধারণা, মেরি সে সে নির্দেশ মানেননি।

এছাড়াও আরো একটি প্রশ্ন উঠেছিলো সেসময়, উচ্চ তাপে খাবার রান্নার পর টাইফয়েড জীবাণু বেঁচে থাকতে পারে না। তাহলে কীভাবে মেরি খাবারের মাধ্যমে টাইফয়েড জীবাণু ছড়াতেন? এই রহস্যের সমাধান করেন জর্জ সপার। তার মতে, মেরি আইসক্রিম তৈরি করতে ভালোবাসতেন। প্রিয় আইসক্রিমের মাধ্যমেই তিনি টাইফয়েড ছড়াতেন। মেরি গুপ্ত ঘাতকের মতো টাইফয়েডের মতো মরণাস্ত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নিজের অজান্তেই।  সূত্র: দ্যগার্ডিয়ান