সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

অরক্ষিত পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে : ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প শেষ হতে চললেও কাঙ্ক্ষিত অর্জন নেই

news-image

সোহেল রশীদ, রংপুর : সড়ক নির্মান করতে গিয়ে রেলওয়ের অনুমতির বৈধতা এবং অবৈধতার মারপ্যাচে বন্দি হয়ে লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে অরক্ষিত এখন বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল জোন। রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ নিয়ে গঠিত এই জোনের ৭১৫ টি লেভেল ক্রসিং চলছে গেটম্যান ছাড়াই।

পাশাপাশি আছে প্রায় ৩৩৯ স্পটে অবৈধ ক্রসিং। রেলওয়ে কর্তপক্ষের ভাষায় অনুমতি না নিয়ে বিভিন্ন বিভাগ এসব লেভেল ক্রসিং তৈরি করেছে। এই দুটি খাতে পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ আগামী বছর শেষ হতে চললেও এই খাতে কাঙখিত কোন অর্জন নেই। বৈধ-অবৈধ এসব লেভেল ক্রসিংয়ে গেট ও গেটম্যান না থাকায় ট্রেনের হুইসেলই ভরসা। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে বড়-ছোট দুর্ঘটনা। জীবনহানি ছাড়াও বিভিন্ন মালামাল ধ্বংস ও নষ্ট হচ্ছে ট্রেনের মুল্যবান সম্পদ। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় এমন দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১২ জনের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ-অবৈধতার ম্যারপ্যাচ নয়- সড়ক নির্মান যারাই করুক না কেন ক্রসিংয়ে গেটম্যান ও গেট নির্মাণের দায়িত্ব নিতে হবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেই।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্র জানায়, রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ নিয়ে গঠিত পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে বৈধ ১ হাজার ৩৪ টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ৭১৫ টিতেই নেই গেটম্যান। মাত্র ৩১৯টিতে গেটম্যান থাকলেও দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে অনুমোদন থাকা ৭১৫টি লেভেল ক্রসিং গেটম্যান ছাড়া চলছে। এগুলোর সামনে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও অবৈধভাবে গড়ে উঠা ৩৩৯টি ক্রসিংয়ের সামনে সতর্কতামুলক সাইনবোর্ড নেই। এরমধ্যে রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের অধীনে ৫৪০ কিলোমিটার রেল লাইনের ৪১৫ টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ৩৩ টি লালমনিরহাটে, ৩২ টি কুড়িগ্রামে, ৩৯ টি রংপুরে, ৪১ টি বগুড়ায়, ৪ ৬টি দিনাজপুরে, ২৮ টি গাইবান্ধায়, ৩৯ টি পঞ্চগড়ে এবং ৩৯ টি ঠাকুরগাঁও জেলায়। এরমধ্যে মাত্র ১১৮টি লেভেল ক্রসিংয়ে গেট ও গেটম্যান রয়েছে। বাকী ২৯৭টি লেভেল ক্রসিংয়ে না আছে গেট, না আছে গেটম্যান। অন্যদিকে ১১৮টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ৬৯টি পরিচালিত হচ্ছে অদক্ষ কর্মচারী দিয়ে। বাকি ৪৯টি পরিচালিত হচ্ছে দিন মজুরির ভিত্তিতে নিয়োগ স্থানীয় অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে। এসব অদক্ষ শ্রমিকদের কাজেও রয়েছে ধারবাহিক গাফিলতি।

রেলওয়ের লালমনিরহাট ডিভিশন অফিস সূত্র জানায়, অরক্ষিত ২৯৭ টি রেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ১১১ টি অবৈধ। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করেই সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ বিভিন্ন সময়ে রেল লাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করতে গিয়ে এসব লেভেল ক্রসিং সৃস্টি করেছে। আইন অনুযায়ী এসব ক্রসিংয়ের গেট ও গেটম্যান থেকে শুরু করে সকল ব্যয়ভার ও দুর্ঢ়টনার দায় । সূত্রমতে অবৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে বেশী ঝুঁকিপূর্ণ ৯৮টিই হলো এলজিইডি, সওজ বিভাগ ও জেলা পরিষদের সৃষ্টি। এছাড়াও রেললাইনের পাশে নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণের কারণেও অবৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়ছে। রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করতে হলে রেলওয়ের অনুমোদন নেয়ার বিধান থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অনুমোদনের তোয়াক্কা করে না।

রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী বেশির ভাগ সংস্থা সড়ক নির্মাণের সময় তাদের অনুমতি নেয়নি। কিন্তু রেলের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নির্মাণ করা বৈধ রেলক্রসিংয়ের ৬১.৫৮ শতাংশই অরক্ষিত।

অনুসন্ধানে জানাগেছে, অরক্ষিত সব ক্রসিং স্পটের উভয় পাশে কর্তৃপক্ষ সতর্কতা সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দিলেও ছোটবড় দুর্ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। এমন একটি অরক্ষিত ক্রসিংয়ে চলতি বছরের ১৫ জুলাই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় রাজশাহী থেকে ছেড়ে যাওয়া পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় বর-কনেসহ মাইক্রোবাসের ১১ যাত্রী নিহত হন। এ ঘটনায় নিজেদের দায় অস্বীকার করেছিল রেল কর্তৃপক্ষ। এমন বড় ঘটনাগুলো নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা হলেও প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ছোট দুর্ঘটনার কোনো খোঁজই রাখে না কেউ।

রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী ২০১৪ সাল থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৮৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় ১১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। লেভেল ক্রসিংয়ে ৯৬টি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯৯ জন। তাঁদের প্রায় সবাই ক্রসিং পার হতে যাওয়া বাস, মাইক্রোবাস ও ছোট যানবাহনের আরোহী। রেলক্রসিং পারাপারের সময় যেসব পথচারী প্রাণ হারান, সেই হিসাব রেল কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করে না।

এক হিসেবে দেখা গেছে, রেল দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি হয়, তার ৮৯ শতাংশই ঘটে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে। কখনো বাসের সঙ্গে, কখনো মাইক্রোবাসসহ অন্য যানবাহনের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে এসব প্রাণহানি ঘটে। অথচ এসব ক্রসিং নিরাপদ করার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিককারে নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লেভেল ক্রসিংগুলোকে বৈধ, অবৈধ, পাহারাদার আছে (ম্যানড), পাহারাদার নেই (আনম্যানড) এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করে রেল কর্তৃপক্ষ। যেসব ক্রসিংয়ে পাহারাদার আছেন, সেগুলোতে লোহার প্রতিবন্ধক থাকে। পাহারাদার ট্রেন আসার সংকেত পেয়ে প্রতিবন্ধক নামিয়ে অন্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে পাহারাদার ভুল না করলে যানবাহনের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ হওয়ার সুযোগ নেই। পাহারাদার ও প্রতিবন্ধক থাকা রেলক্রসিংয়ে তাই দুর্ঘটনাও খুব কম। পাহারাদার নেই এমন ক্রসিং অরক্ষিত।

রেল আইনমতে লাইনের দুই পাশে ১০ ফুট করে মোট ২০ ফুট এলাকায় যেকোনো মানুষ প্রবেশ করলেই তা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। এমনকি ২০ ফুটের মধ্যে কোনো গবাদিপশু প্রবেশ করলেও তা আটকের মাধ্যমে বিক্রি করে রেলওয়ের কোষাগারে জমার নিয়ম রয়েছে। এ জন্যই রেল কর্তৃপক্ষ ক্রসিং নিয়ে খুব একটা পাত্তা দেয় না।

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. খলিলুর রহমান জানান, লেভেল ক্রসিং বৈধ-অবৈধ ধারণাটি ভুল। এ বিষয়ে অনেক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে। সমাধানে আসা যায়নি। একের পর এক মানুষের প্রাণহানি বেদনাদায়ক। তিনি বলেন টাকা কে খরচ করবে? সবই তো সরকারি টাকা। মানুষের নিরাপত্তাই মূল। কারিগরি কিংবা যৌক্তিকতার কোনো বিবেচনাতেই লেভেল ক্রসিং এলজিইডি বা অন্য সংস্থার পক্ষে রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব নয়। এটা রেলেরই দায়িত্ব।

সাধারন পথচারী ও যানবাহনকে এসব অরক্ষিত রেল ক্রসিং পারি দিতে হয় ঝুঁকি নিয়ে। অরক্ষিত রেল ক্রসিং গুলোতে গেট তৈরী ও গেটম্যান নিয়োগ করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে
রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহারাদার ছাড়া কোনো লেভেল ক্রসিং রাখার অর্থই হলো, এখানে প্রাণ ঝরবে। এটা জেনেও যদি কেউ সুরক্ষার ব্যবস্থা না নেন, তাহলে তো বলতে হবে, মানুষের মৃত্যুতে তাঁদের মাথাব্যথা নেই। সড়ক ও রেল দুটিই জনগণের জন্য এবং তাঁদের টাকায় নির্মাণ করা হয়। ফলে সুরক্ষা তাঁদের প্রাপ্য। রেল কর্তৃপক্ষের কাছে সাধারন মানুষের এই ন্যায্যতা প্রাপ্তির বিষয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই।

এ ব্যপারে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েও প্রধান প্রকৌশলী আল ফাত্তাহ মোঃ মাসউদুর রহমান জানান, রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ নিয়ে গঠিত আমাদের পশ্চিমাঞ্চলে জোনে অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং রয়েছে এক হাজার ৩৪টি। এর মধ্যে ৩১৯টিতে গেটম্যান আছে। বাকিগুলোতে আপাতত গেটম্যান নেই। এসব ক্রসিং পারাপার হতে হয় নিজ দায়িত্বে।

রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে রেলওয়েতে ১ হাজার ৪১ কোটি টাকা ব্যায়ে ৪৮টি প্রকল্প চলমান আছে। এর মধ্যে রেলক্রসিং পুনর্বাসন ও মানোন্নয়নে প্রকল্পের একটি পূর্বাঞ্চলে, অন্যটি পশ্চিমাঞ্চলের। পশ্চিমাঞ্চলে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর আওতায় ৩২৬টি ক্রসিংয়ের মান উন্নয়ন ও পাহারা দেওয়ার জন্য ৮৫১ জন লোক নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। নিয়োগ হয় ৭৬৮ জন। তাঁদের মধ্যে ১৩৯ জন চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। বাকিরা ৩ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। প্রকল্প– সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন করে প্রকল্প না নেওয়া হলে বাস্তবায়ন করা প্রকল্প বৃথা যাবে।

এই প্রকল্পের পরিচালক নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংগুলো সুরক্ষায় কাজ করা হচ্ছে। সেই সাথে অবৈধ এবং গেটম্যান নেই এমন লেভেল ক্রসিংগুলোকেও সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। ২০১৫ থেকে বাস্তবায়িত প্রকল্পের আওতায় এসেছে ৩২৬টি ক্রসিং। অনুমোদন পেয়েছে ৫৩টি অবৈধ ক্রসিং। এছাড়া ২০৪টি ক্রসিংয়ে গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক মো আবদুল আউয়াল ভূঁইয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু ক্রসিংয়ে গেটম্যান নেই। অস্থায়ী লোকবল নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে আশা করি। অবৈধ ক্রসিং নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সাথে আলোচনা করেও আমরা সেভাবে তাদের সারা পাচ্ছি না। বিষয়টি আন্তরিকতার সেখা প্রয়োজন।