সোমবার, ২৭শে জানুয়ারি, ২০২০ ইং ১৪ই মাঘ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

‘ক্যাসিনোর সরঞ্জাম নেপালিদের মাধ্যমে ঢাকায় এনেছিল দুই ভাই’

news-image

নিজস্ব প্রতিবেদক : ক্যাসিনোকাণ্ডে পলাতক আলোচিত এনামুল হক এনু ভূঁইয়া ও রূপন ভূঁইয়া নামে দুই ভাই নেপালিদের মাধ্যমে ক্যাসিনোর আধুনিক সরঞ্জাম ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। ক্যাসিনোর কালো টাকার মাধ্যমেই সম্পত্তি, টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়িসহ অঢেল সম্পদ গড়েছেন এই দুই ভাই।

আজ সোমবার নগদ ৪০ লাখ টাকাসহ এই দুই ভাইকে গ্রেপ্তারের পরে এসব কথা জানিয়েছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) ইমতিয়াজ আহমেদ।

সিআইডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘সোমবার ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় নগদ ৪০ লাখ টাকা, ১২টি মোবাইল ফোন, বাড়ির দলিলপত্র এবং ব্যাংকের কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর ২২টি জমির দলিল, পাঁচটি গাড়ির কাগজ এবং ৯১টি ব্যাংক হিসাবে ১৯ কোটি টাকার কাগজপত্র পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে ওই ব্যাংক হিসাবগুলো জব্দ করা হয়েছে।’

ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘নেপালিদের মাধ্যমে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম ঢাকায় এনেছিল দুই ভাই। ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর দিকে গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর এনু-রুপন ও তাদের দুই সহযোগীর বাসা থেকে পাঁচ কোটির বেশি টাকা, আট কেজি স্বর্ণ ও ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর ও ওয়ারী থানায় সাতটি মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনার পরে এনু ও রুপন ভূঁইয়া তাদের সহযোগীসহ গা ঢাকা দেয়। এই মামলাগুলোর মধ্যে মানি লন্ডারিং আইনের চারটি মামলার তদন্ত শুরু করে সিআইডি। সেই মামলাতেই তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

ভুয়া পাসপোর্ট করে তারা বিদেশে পালাতে চেয়েছিলেন উল্লেখ করে সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান ‍শুরুর পর প্রথমে তারা পালিয়ে কক্সবাজার গিয়েছিল। সেখান থেকে তারা মিয়ানমার অথবা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এতে সফল না হওয়ায় তারা আবারও কেরাণীগঞ্জে চলে আসেন। কেরাণীগঞ্জে তারা তাদের এক কর্মচারীর বাসায় এতদিন আত্মগোপনে ছিলেন। তাদের কাছে নগদ ৪৬ লাখ টাকা ছিল। এই টাকা দিয়ে তারা ভুয়া পাসপোর্ট করে ভারত হয়ে অন্য দেশে যেতে চেয়েছিলেন।’

প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে প্রথম দিনই রাজধানীর ইয়াংমেনস ফকিরাপুল ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক (পরে বহিষ্কার করা হয়) খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন অভিযানে একে একে গ্রেপ্তার হন কথিত যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমসহ অনেকেই। গ্রেপ্তার হওয়া এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বিপুল অর্থের মালিক হওয়া, অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগ ওঠে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের অপকর্মে সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সাংসদ, রাজনীতিক, রকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্নজনের নাম উঠে আসে। তখনই এই দুই ভাই এনামুল হক এনু ভূঁইয়া ও রূপন ভূঁইয়া আলোচনায় আসেন। তবে শুরু থেকেই তারা পলাতক ছিলেন।

গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর এনামুল ও রূপনদের বাসায় এবং তাদের দুই কর্মচারীর বাসায় অভিযান চালায় র‍্যাব। সেখান থেকে পাঁচ কোটি টাকা এবং সাড়ে সাত কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। এরপর সূত্রাপুর ও গেন্ডারিয়া থানায় তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। একাধিক বার অভিযান চালিয়েও এত দিন তাদের ধরা যায়নি। এনামুল ও রূপন গত ছয় থেকে ৭ বছরে পুরান ঢাকায় বাড়ি কিনেছেন কমপক্ষে ১২টি। ফ্ল্যাট কিনেছেন ছয়টি। পুরোনো বাড়িসহ কেনা জমিতে গড়ে তুলেছেন নতুন নতুন ইমারত।

স্থানীয় লোকজন জানান, এই দুই ভাইয়ের মূল পেশা জুয়া। আর নেশা হলো বাড়ি কেনা। জুয়ার টাকায় এনামুল ও রূপন কেবল বাড়ি ও ফ্ল্যাটই কেনেননি, ক্ষমতাসীন দলের পদও কেনেন বলে জানা যায়। ২০১৮ সালে এনামুল পান গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির পদ। আর রূপন পান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ। তাদের পরিবারের পাঁছ সদস্য, ঘনিষ্ঠজনসহ মোট ১৭ জন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগে পদ পান। তারা সরকারি দলের এসব পদ-পদবি জুয়া ও ক্যাসিনো কারবার নির্বিঘ্নে চালানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন বলে স্থানীয় লোকজন জানান।