বৃহস্পতিবার, ৬ই আগস্ট, ২০২০ ইং ২২শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ফুলবাড়িতে শুস্ক মৌসুমেও পানিতে তলিয়ে আছে বিস্তীর্ণ কৃষি জমি : হতাশায় ৫ শতাধিক কৃষক

news-image

রংপুর ব্যুরো : দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে অপরিকল্পিত পুকুরের পাড় তৈরি ও কালভার্ট বন্ধ করায় পানিতে তলিয়ে আছে দুই হাজার বিঘা কৃষি জমি। গত কয়েক বছরে এমন অবস্থায় বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছে পাঁচ শতাধিক কৃষক। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিলেও এখন পর্যন্ত কোন সুরাহা হয়নি। ফলে পরিবার পরিজন নিয়ে বেশ হতাশায় দিন কাটছে তাদের।

সরেজমিনে ফুলবাড়ীর দৌলতপুর ইউনিয়নের বাড়াইপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পৌষের এই শুস্ক মৌসুমেও দেখলেই মনে হচ্ছে বর্ষাকাল। শুধু বাড়াইপাড়া গ্রাম নয়, পাশের খয়েরবাড়ি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামসহ সব মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার বিঘা ফসলি জমি এই খরা মৌসুমেও ডুবে আছে পানিতে। ব্যক্তিগত ও খাসজমি বরাদ্দ নিয়ে অপরিকল্পিত ভাবে প্রায় ৯টি পুকুরের পাড় তৈরি এবং রাস্তার উপর সচল ৬টি কালভার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এমন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে গত দুই বছর যাবৎ কোন ফসলই আবাদ করতে পারছেন না ঐ সব জমির কৃষকরা। বেকার হয়ে বসে আছেন অ¤্রবাড়ী, পূর্ব মহেষপুর, মহাদীপুর, বারাইপাড়া, লালপুর, নারায়নপুরসহ প্রায় ১০টি গ্রামের ৫ শতাধিক কৃষক।

ফুলবাড়ী উপজেলার মহাদীপুর গ্রামের কৃষক শাহদুল হক জানান, তার ৮ বিঘা জমি। পানি প্রবাহের পথে পুকুর খনন করে পাড় করে দেয়ায় এবং কালভার্টগুলো বন্ধ করে দেয়ায় বন্ধ রয়েছে পানি প্রবাহ। ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় পানিতে ডুবে আছে তার সব আবাদী জমি। আবাদী জমি ডুবে থাকায় ২ বছর ধরে সেসব জমিতে আবাদ করছে পারছেন না তিনি। তিনি ২ বছরে এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারেননি বলে জানান।

একই গ্রামের কৃষক ইউনুস আলী জানান, কৃত্রিম জলাবদ্ধতার ফলে পানিতে ডুবে থাকার কারনে গত ২ বছওে তার ১০ বিঘা জমিতে কোন ফসলই আবাদ করতে পারেন তিনি। কৃষক সজিবুল ইসলাম জানান, প্রতিবছর তার ৫ বিঘা জমিতে ১৮০ মন ধান পেতেন তিনি। কিন্তু ২ বছর ধরে আবার করতে না পারায় এক কেজি ধানও ঘরে তুলতে পারেননি তিনি। এই অবস্থায় অন্য কোন পেশা না থাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে চরম সংকটে রয়েছেন তিনি।

খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোজাফ্ফর হোসেন চৌধুরী জানান, গ্রামের কিছু প্রভাবশালী পানি প্রবাহের পথে ৯টি পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছে। পুকুর খনন করতে গিয়ে নির্মাণ করেছে উঁচু পাড়। পুকুরের পাড় নির্মাণ করায় ৬টি কালভার্ট দিয়ে পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে ২ বছর ধরে ২ হাজার একরেরও বেশি অনাবাদী হয়ে পড়ে আছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে বার বার যোগাযোগ করেও কোন লাভ হয়নি বলে জানান তিনি।

পানি প্রবাহের পথে যারা পুকুর খনন করে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন গড়পিংলাই গ্রামে সামস সুমন মিশুক। পুকুর খনন করে কেন এভাবে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়া হলো এবং সরকারি কালভার্ট বন্ধ করা হলো কেন-এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তিনি একাই এটা করেন নি। আরও ৮টি পুকুর খনন করা হয়েছে। অন্যরা পুকুরের পাড় ভেঙে দিলে তিনিও দেবেন। তিনি জানান, পানিতে আবাদী জমি ডুবে থাকার কারণে তাদেরও ফসল হচ্ছিল না। এই কারণেই এখন পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছেন তারা। তিনি পানি নিষ্কাশনের জন্য ক্যানেল নির্মাণ কাজ চালুর দাবি জানান।

এদিকে বারাইপাড়া গ্রামের কৃষক হারুন-উর রশিদ জানান, পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি অপরিকল্পিত ক্যানেল খনন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যা খনন হলে বর্ষার সময় পানি উল্টো গ্রামে ঢোকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই পুকুরের পাড় ভেঙে দিয়ে ও কালভার্ট গুলোর মুখ খুলে দিলে আগের মত পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানান তিনি। এতে এসব জমিতে আগের মতো আবার আবাদ করতে পারবে ভুক্তভোগী কৃষকরা।

তিনি জানান, স্থায়ী সমাধানের আশায় একাধিকবার মানববন্ধনসহ সংস্লিষ্ট সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি প্রদান করেও আজ অবধি কোন ফল পায়নি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। পানি নিষ্কাশনের পথ খুলে দিয়ে ২ হাজার একর জমিতে আবাদের সুযোগ সৃষ্টি করে কৃষকদের বাঁচানোর দাবি জানান তিনি।

এ ব্যাপারে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম জানান, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। দ্রুত এই সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান তিনি।