রবিবার, ২৯শে মার্চ, ২০২০ ইং ১৫ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

নতুন বইয়ের গন্ধে শিক্ষার্থীদের বছর শুরু

news-image

কায়ছার আলী : “সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা। একজন মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে ছাত্র/ছাত্রীদের ২৪ বৎসর যাবত শিখিয়েছি ‘সদা সত্য কথা বলিবে’। আর তাদের স্যার হিসেবে বর্তমান সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্যের দুটো কথা, কিছু সত্য, লিখতে না পারলে নিজের বিবেকের কাছে চিরকাল দায়ী বা ঋণী থাকব। তাই তো বিবেকের কারফিউ ভেঙ্গে কিছু সত্য লেখার জন্য চিরসঙ্গী কলম ও দুটো কাগজের পাতা নিয়ে কয়েকটি পত্রিকার রিপোর্টের ভিত্তিতে লিখতে বসলাম। আসলে রিপোর্ট হলো তথ্যের নির্মোহ গাঁথুনি, যাতে থাকে না, অনাহুত মন্তব্য, অপ্রয়োজনীয় বিশ্লেষন, অযাচিত পক্ষ পাতিত্ব এতে শুধুই থাকে তথ্যের সোজাসাপ্টা বর্ণনা।

সে কারনে এটি হয়তো সুখ পাঠ্য ঠিক নয়। কিন্তু দেশ ও জাতির জন্য খুবই দরকারি। আজ ১লা জানুয়ারি ২০২০ খ্রিঃ রোজ সোমবার। সারা বিশ্বের মত এদেশে ও পালিত হচ্ছে বিশেষ করে তরুন প্রজন্মের মাঝে Happy New Year- 2020. এ বছর প্রাক- প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, এস.এস.সি ভোকেশনাল, ইবতেদায়ী, দাখিল ও দাখিল ভোকেশনালে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ২৭ লক্ষ ৭২ হাজার ৭৪৭ শিক্ষার্থীর জন্য ৩৫ কোটি ৩৯ লক্ষ ৯৪ হাজার ১৯৪ টি পাঠ্য বই গত বছরের ৩০ শে নভেম্বরের মধ্যেই সকল জেলা, উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানো হয়েছে। এবার চতুর্থবারের মতো প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ব্রেইল বই দিচ্ছে সরকার। এছাড়া ৫ টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিশুদের নিজেদের মাতৃভাষায় বই দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে (মাদ্রাসা ও সমমানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে) জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে “পাঠ্যপুস্তক উৎসব দিবস। এই উৎসবের আমেজ সোনালী সূর্যের আভায় ছড়িয়ে পড়েছে বাঙ্গালী জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর স্বাধীন বাংলায় রাজধানী, নগর, শহর, বন্দর, গ্রাম, নিভৃত পল্লী, দূর্গম পাহাড়ী এলাকা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, চর, হাওড়, বাওড়সহ প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় নতুন বই পেয়ে নিজ নিজ ঘরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ফিরছে ভিশন-২০২১ বা ডিজিটাল বাংলাদেশ নিকট ভবিষ্যত ইনশাআল্লাহ যারা গড়বে সেই প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থী/শিক্ষার্থিনীরা।

এজন্য অবশ্যই অভিনন্দন, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই প্রথমে সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে, পরে ধন্যবাদ জানাই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীকে। আকাশে ঐ প্রকান্ড সূর্য যেভাবে ধনী, গরীব, জাতী, ধমর্, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে আলো ও তাপ বিলিয়ে দেয় ঠিক যেভাবে বর্তমান সরকার বছরের প্রথম দিবসেই নতুন পাঠ্যবই বিতরণ করে সবাইকে একাকার করে, একই নেটওয়ার্ক বা একটি বিনি সুতোর মালাদিয়ে সুন্দরভাবে গেঁথে সাজিয়ে দিয়েছেন। আমি গ্রামে শিক্ষকতা করি কিন্তু শহরে বাস করি। গ্রামের বেশির ভাগ ছাত্র/ছাত্রী মার্চ বা এপ্রিলের আগে তাদের পাঠ্য বই কিনতে পারতো না। তারা আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী ও বড় ভাই বোনদের নিকট থেকে ছেঁড়া বা পুরাতন বই অর্ধ মুল্য বা স্বল্প মুল্য দিয়ে কিনে লেখাপড়া করতো। সত্যি কথা হলো ছাত্র-ছাত্রীদের নতুন বই না হলে হৃদয়ে বা মনে উৎসাহ তৈরি হয় না। পাঠ্য বইয়ের অভাবে তাই ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষকরা শ্রেণীতে বছরের শুরুতে পরিপূর্ণ পাঠদান করতে পারতেন না। কিছু সংখ্যক অভিভাবক উপবৃত্তির টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চালাতেন।

আজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপস্থিতি বেড়েছে, কমে গেছে বৈষম্য এবং ঝড়ে পড়ার হার। পূর্বেও উপবৃত্তি চালু ছিল শুধুমাত্র ছাত্রদের মধ্যে কিন্তু এখন উপবৃত্তি চালু আছে দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র ও ছাত্রীদের মাঝে, যাতে তারা লেখাপড়ার উৎসাহ পায়। ১১তম বছরের মত নতুন পাঠ্যবই পাওয়ায় বছরের প্রথম দিনটিতে শুরু হলো পরিপূর্ণ কর্ম দিবস। আজ বিদ্যালয়গুলো কানায় কানায় পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। গত ১০ বছর যাবত (২ জানুয়ারি) কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় দেখেছি ছোট্ট সোনামণিরা আগামী দিনের ভবিষ্যত সুনাগরিকেরা গ্রামের আঁকা বাঁকা মেঠো পথে দৌড়ে এবং বিভিন্নভাবে (কি অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্য!) তাদের প্রাণ প্রিয় বিদ্যালয়ের দিকে ছুটে যাচ্ছে, এ আশায় নতুন বই হাতে পাবে এবং সহপাঠীদের বলবে তোর আগে আমি স্যার বা ম্যাডাম বা অতিথির কাছ থেকে বই নিয়েছি, তাঁদের সাথে হাত মিলিয়েছি। তারা আমার ছবি তুলেছে, আরো কত কি? (পাঠ্যবইয়ের Demand এর চেয়ে supply বেশি)। অবাক করা বিষয় হলো এত বিপুল সংখ্যাক বই পৃথিবীতে কোথাও বিতরন করা হয় না এবং শিক্ষায় ছেলে-মেয়ে সমতা অর্জন বিশ্বের রোল মডেল। ৫৫০ জন শিক্ষক,শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ দিয়ে একটি নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করে ১১১ টি বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌছে দেয়া হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো পাঠ্যবই গুলো ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে । আইসিটি, কম্পিউটার শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, মেয়েদের শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা, চারু ও কারুকলা, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন বিষয় সুন্দর ভাবে পাঠ্যবইতে সংযোজন করা হয়েছে।

যা এর আগে কেউ চিন্তাও করেনি।J.S.C বা বার্ষিক পরীক্ষা শেষে শীতকালীন বা বড়দিন উপলক্ষ্যে প্রিয় বিদ্যালয় কয়েকদিন বন্ধ থাকায় অতি চেনা জানা পাশে বসা সহপাঠীদের সাথে দেখা হয়নি, ভাগভাগি করে খাওয়া হয় নি, মনের ভাব প্রকাশ হয়নি, খেলায় হারজিৎ হয়নি (বন্ধ বিদ্যালয় ছাত্র/ছাত্রীদের ভাল লাগে না)। আসলে ছাত্র/ছাত্রীরা বিদ্যালয়কে হৃদয় দিয়ে ভালবাসে। Renowned মনোবিজ্ঞানী এরিকবার্ন বলেছেন মানুষের জন্ম হয় তিনবার। প্রথমত Cellular Birh (মাতৃগর্ভে) দ্বিতীয়ত Physical Brith (শারীরিকভাবে) এবং তৃতীয়ত Social Birth (সামাজিকভাবে)। সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হলো Social Birth যা শিশুর বয়স ৫+ হলে শুধুমাত্র বিদ্যালয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়। উন্নত বিশ্বে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বছরে ১২০০ ঘন্টা এবং আমাদের দেশে মাত্র ৭০০ ঘন্টা অবস্থান করে।

এজন্য বর্তমান সরকার শিক্ষার্থীদের মেধা পরিপূর্ণ বিকাশের বা মুখন্ত নির্ভরতা সর্ম্পূর্ণ কমিয়ে আনার জন্য¨ S.A এবং C.A পদ্ধতি চালু করেছে। যাতে বিদ্যালয়ের Working Hours বৃদ্ধি পায়। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী এদেশে ইতিমধ্যে চালু হয়েছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম। এর ফলে বিদ্যালয়ের প্রতি শিশুদের আগ্রহ সৃষ্টি, সুকুমার বৃত্তির অনুশীলন, অন্যদের প্রতি সহনশীলতা এবং পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য শৃঙ্খলাবোধ সম্পর্কে ধারনা জন্মাছে। ৩১ টি মাদ্রাসাতে অনার্স কোর্স এবং স্বতন্ত্র ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় চালুর পাশাপাশি সরকার কারিগরি, ভোকেশনাল সহ সর্বত্র মানসম্মত শিক্ষার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া পাঠ্যপুস্তকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ ২৩৩৩১ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম স্থাপন, শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট এর আওতায় স্নাতক পর্যায়ে বৃত্তি, শ্রেণীতে মান সম্পন্ন পাঠদানের C,D প্রদান, সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা, মাদ্রাসার মুলধারার সাথে বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা অন্তর্ভূক্তি বা আধুনিকায়ন, ১০ লক্ষ শিক্ষকের শিক্ষার্থীদের মুল্যায়নের বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ২৬,১৯৩ টি বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ২০১৩ সালে জাতীয়করণ করা হয়। সেকায়েপ প্রকল্পের মাধ্যমে তুলনা মূলক পশ্চাদপদ স্কুল বাছাই করে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের ১১ লক্ষ অতিরিক্ত ক্লাস নেয়া হয়েছে। আইসিটি এডুকেশন চালুর পাশাপাশি মেয়েদের জন্য ৭ টি বিভাগে ৭টি সরকারি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট করা হয়েছে।

গত ২৭ শে ডিসেম্বর ২০১৯ রাজশাহী কলেজের এক অনুষ্ঠানে মাননী শিক্ষা মন্ত্রী বলেন, “দেশের ১৩ টি শতবর্ষী সরকরি কলেজ হবে সেন্টার অব এক্সিলেনস”। যা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে সবচেয়ে ভাল লেগেছে ৬০ দিনে পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং ৫ম শ্রেণীতে (১১ বার) ৮ম শ্রেনীতে (১০ বার) মাদ্রাসা সহ Public পরীক্ষা গ্রহন। এই পরীক্ষায় বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণের ফলে ছাত্র/ছাত্রীদের মধ্যে পরীক্ষাভীতি দুর হচ্ছে এবং প্রতিযোগিতা সম্পর্কে ধারণা জন্মাচ্ছে। অন্যদিকে মেধাবীরা বৃত্তি পাচ্ছে। পূর্বে প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে কিছু সংখ্যক মেধাবী ছাত্র/ছাত্রীদের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করত। কিন্তু বছরের শুরুতেই সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যবই প্রদান করায় এবং Public পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শহরের মত গ্রামেও জিপিএ-৫ বা (অদম্য মেধাবী) বৃত্তি পাচ্ছে।

শুধু এখানেই শেষ নয়, ইলেট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়ার কারণে অজপাড়া গাঁ থেকে প্রতিভাবান ক্ষুদে কৃতি শিক্ষার্থীদের জীব বৃত্তান্ত সারাদেশ সহ সমগ্র বিশ্ব একসাথে জানতে পারছে। ইতিহাসে পড়েছি নবাব শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় ৮ মন চাল বা সস্তায় জিনিসপত্র পাওয়া যেত কিন্তু বিনামূল্যে এদেশে মাধ্যমিকে (সমমানসহ) পাঠ্যবই পাওয়া যেত কিনা জানিনা। তাইতো এ মহান কর্মসূচির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। তাই লিখা শেষ করার আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আবারও ধন্যবাদ না জানালে হয়তো ভুল করবো। তাই ধন্যবাদ, অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে কবি john keats এর Ode on a Grecian Urn কবিতার কালজয়ী উক্তি লিখে শেষ করছি Beauty is Truth, Truth Beauty”

লেখকঃ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, ০১৭১৭-৯৭৭৬৩৪, kaisardinajpur@yahoo.com
সদস্য, দিনাজপুর কলামিস্ট এসেসিয়েশন, দিনাজপুর । ০১৮১৮-২৩০৯৭০